Gadiara revisit after 45 years
গাদিয়ারা ৪৫ বছর পর
প্রথমবার যখন এখানে পা রেখেছিলাম সেটা ছিল ৪৫ বছর আগে - ১৯৮১ সালে। পাড়ার পিকনিক পার্টির সাথে বাসে করে এসেছিলাম গাদিয়ারা। আজ যখন এখানে এলাম তখন স্মৃতির পাতা হাঁটকে দেখলাম কিচ্ছুটি মনে নেই! তবু আশা আছে পুরোটা ঘুরে দেখলে কিছু না কিছু স্মৃতির কোনে উঁকি মারবেই। তার আগে অবশ্য বাসস্হানের ব্যবস্হা করা প্রয়োজন!
আমাদের সাথে আমাদের প্রিয় চতুষ্পদ পোষ্য ডাইচি চলেছে আর তাই সঙ্গত কারনেই সরকারী টুরিজমের বাঙলোতে আমাদের কোনও জায়গা হল না! এই একটা জায়গায় আমাদের পশ্চিমবঙ্গ টুরিজম ইউ পি বা অন্যান্ন টুরিজমের থেকে পেছনে পড়ে রয়েছে! একটা ফ্যামিলি যখন কোনও জায়গায় ঘুরতে যায় তখন তার সাথে তার পরিবারের লোকজনের সাথে তার পোষ্যও ঘুরতে যায় অথচ পরিবারের সবায়ের জন্য সরকারী বাঙলো বা গেস্টহাউসে জায়গা মিললেও পোষ্য জায়গা পাবে না। আজ থেকে ৫০ বছর আগে হয়তো পোষ্যকে পোষা আমাদের দেশে বিলাসিতা ছিল কিন্ত আজ নয়। আজ পাড়ায় পাড়ায় যেমন পলিক্লিনিক বা নার্সিং হোম পাওয়া যায় ঠিক তমনই ভেট্রিনারী ক্লিনিকও আছে যেখানে পোষ্যদের লাইন পড়ে যায় ডাক্তারকে দেখানোর জন্য!
অথএব সুদৃশ্য বিশাল ঘেরা সরকারী রির্সট রুপমন্জরীকে ছাড়িয়ে রুপনারায়নের বাঁধ ধরে এগিয়ে চললাম পরবর্তী প্রাইভেট রির্সট গঙ্গাদর্শনের উদ্দেশ্যে। রুপনারায়ন নদীর পাড়ে একটা মাঝারি মাপের শিপইর্য়াড রয়েছে যাতে বিশাল মাপের দুটো ক্রেন ক্রমাগত মাল ওঠানো নামানো করছ। এটাকে ছাড়িয়ে একটু এগিয়ে গেলেই দেখা মিলল গঙ্গাদর্শন রির্সট! ডাইচির সাথে এক কথায় আমাদের রুম পাওয়া গেল। শুধু শ্রীমান ডাইচি রেস্টুরেন্ট বা কাফেটেরিয়াতে যেতে পারবে না যা মূলত সমস্ত পেটফ্রেন্ডলি রির্সটে একটা ইউনিভার্সাল নিয়ম!
এখান থেকে মাত্র ১০০ মিটার দুরে এখানকার সর্বশেষ রির্সট - পূর্নিমা।
অর্থাত শুরুতে রাস্তার বাঁকে বাঁধের উপর প্রথমে রুপমন্জরী (সরকারী রির্সট) ৩০০ মিটার বাঁধের উপর পরবর্তী গঙ্গাদর্শন ও তার ১০০ মিটার পরে পূর্নিমা, এই হল গাদিয়ারাতে থাকার ঠিকানা। এরিয়ার হিসাবে রুপমন্জরী ও গঙ্গাদর্শন প্রায় সমান সমান। পূর্নিমার এরিয়া বেশ ছোট কিন্তু লোকেশান এক্কেবারে শেষ প্রান্তে ও সামনে বাধাহীন রুপনারায়ন ও গঙ্গার সঙ্গম দৃশ্যমান! থাকার দক্ষিনা তিনটি রির্সটেরই প্রায় সমান সমান, তুল্যমুল্য তারতম্য থাকতে পারে যা জানা নেই!
ডাইচির সাথে থাকার জন্য আমাদের একটু খোলামেলা জায়গা দরকার আর তাই আমরা গঙ্গাদর্শনকেই বেছে নিলাম!
গঙ্গাদর্শন রির্সট।গাদিয়ারা: গাদিয়ারা হল রুপনারায়ন আর গঙ্গানদীর মিলনস্হল। ১৯৪২ এর ভয়ঙ্কর বন্যার পর দুটি নদীই পাড় বরাবর ছাপিয়ে যায় যা আজ প্রায় ৫০০ মিটার বিস্তার হয়ে গেছে উভয়দিকে! সুবিশাল জলরাশির মধ্যে দুই নদীর এই বিশাল মিলনস্হলই হল গাদিয়ারা মোহনা! গঙ্গার আসল নাম এখানে হুগলী নদী। হুগলী নদী এখান থেকে আগে বয়ে গেছে ডায়মন্ড হারবার আর তারপর বঙ্গোপসাগরে মিশেছে।
ঐতিহাসিক রুপরেখায় এই জায়গাটির গুরুত্ব রর্বাট ক্লাইভের আমলে অনুভূত হয়েছিল প্রথম - সমুদ্র থেকে আগত জাহাজকে কোলাঘাটের দিকে দিকনির্দেশ করার জন্য এখানে একটি লাইটহাউস বা ওয়াচ টাওয়ার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যার অবশেষ এখনও রুপমন্জরীর প্রান্তে বাঁধ বরাবর হাঁটলে দেখতে পাওয়া যায়!
পাইরেটস্ বা জলদস্যুদের হাত থেকে বানিজ্যতরীকে রক্ষা করার জন্য এখানে একটা আস্ত ফোর্ট ছিল ইংরেজদের যার নাম মর্নিংটন ফোর্ট। এই দূর্গ এখন বিশাল জলরাশির নীচে সমাহিত যা ভাটার সময় রুপমন্জরীর সামনে অল্পসল্প ভগ্নাবশেষ দেখা যায় সত্যাসত্য জানা নেই! রুপমন্জরীর ক্যাম্পাসের মধ্যেই ছিল ইংরেজদের পোর্ট অফিস বা কাস্টমস্ অফিস যা এখন ঢুকলেই সামনে হেরিটেজ বিল্ডিং নামে পরিচিত!
বিগত দিনের লাইট হাউস
৪৫ বছর আগে: ৪৫ বছর আগে আমি যে জায়গাটাতে এসেছিলাম সেটা তখন ছিল গাদিয়ারার একমাত্র সরকার নিয়ন্ত্রিত পিকনিক স্পট! সরকারী রিসর্ট বা রুপমন্জরী তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে নিহিত ছিল। হেরিটেজ বিল্ডিং এ তখন সম্ভবত কোনও অফিস বসত। মর্নিংটন ফোর্টের ধংসাবশেষ তখন দেখেছিলাম কিনা মনে নেই। লাইটহাউস টা তখন ছিল। সেদিনটা ছিল সকালে এসে খাওয়া দাওয়া করে বিকালে ফেরত যাওয়া ফলত্ স্বল্প সময়ের মধ্যে সেদিনকার স্মৃতি আজ বড়ই অস্পষ্ট হয়ে গেছে।
আজকের গাদিয়ারা: আজকের গাদিয়ারাতে দর্শনীয় বলতে এটুকুই - ইতিহাসের সাথে স্বল্প আলাপচারিতা আর বাঁধ বরাবর হাঁটার সাথে সাথে যতদুর চোখ যায় শুধু বিশাল জলরাশি আর তার সাথে ভাসতে থাকা বিভিন্ন সাইজের নৌকা বা স্পীডবোটের মেলা। ইচ্ছে করলে ফেরী ধরে ওপারে নূরপুর বা গেঁয়োখালি ঘুরে আসা যায়! খুব একটা বিশেষ টুরিস্ট এখানে আসে না। যাও বা অল্প সল্প সমাগম হয় তা শনি রবিবার বা ছুটির দিনেই সীমাবদ্ধ থাকে। সপ্তাহের মাঝে একেবারেই ফাঁকা থাকে। আমদের অবশ্য
হেরিটেজ বিল্ডিং
সেসবের বালাই নেই। দুটো দিন আরাম করে ডাইচির সাথে বাঁধ বরাবর লম্বা হাঁটা মাঝে বসার জায়গা পেলে বসে পড়া, সকালবেলা বিভিন্ন অজানা পাখীর ডাক শোনা আর খাওয়া, এই ছিল আমাদের দুদিনের সার্বিক রুটিন!
খাওয়া দাওয়া: একদম ঘরোয়া খাওয়া দাওয়া কিন্তু স্বাদে অসাধারন! ভ্যারাইটি মাছ - পমফ্রেট, ভেটকি, ইলিশ বা রুই কাতলা সব পাওয়া যায়। আমরা পমফ্রেট, ভেটকি, ইলিশ তিনটিই টেস্ট করেছি এখানে। আর খাবারের দামও অন্যান্ন টুরিস্ট স্পটের মতো আকাশ ছোঁয়া নয়! এমনিতে গাদিয়ারা দু দিন থাকার জায়গা নয় কিন্তু শুধু টেস্টি খাবারের জন্য আমরা একদিন বেশি থেকে যাই। আর নিরিবিলি নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে, বসে, ডাইচির পেছন পেছন দৌড়ে, পাখীর ডাক শুনতে শুনতে দুটো দিন কোথাদিয়ে কেটে গেল বুঝতেই পারলাম না!
নদীর তীরে অলস দুপুর
সোমনাথ বেরা
২৯/৯/২৬










Comments
Post a Comment