Down memory lane - 1
Down memory lane
আজ এই পরিনত বয়সে এসে অবসর সময়ে যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা গল্প করি তখন বুঝতে পারি সবাই কত বিশাল আর বিচিত্র রকমের পরিস্হিতির মধ্যে দিয়ে জীবনের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে! আজকের গল্পমালা হল সেই বিচিত্র জীবনযাত্রার কিছু সুক্তিরত্নাবলি।
পদ্মপুকুর স্টেশন: প্রথমে কলেজসূত্রে এবং তারপর চাকরীসূত্রে দীর্ঘ ৪৫ বছর আমি বাড়ীর বাইরে ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। মাঝে মাঝে অবশ্যই মা আর মাটির টানে জন্মভূমি হাওড়া ঘুরে গেছি। আর এই মাঝে মাঝে আসার ফলে এই জায়গাটার পরিবর্তন আমি বার বার অনুভব করতে পেরেছি। এই পরিবর্তনের সারিতে প্রথমেই আসে পদ্মপুকুর স্টেশন।
এই ছোট্ট স্টেশনটার শিরোনামে আসার মতো কোনও উপাদান নেই! এখন যেখানে ঝাঁ চকচকে প্লাটফর্ম তৈরী হয়েছে তার ঠিক উত্তর দিকে একশ মিটারের মধ্যে ছিল একটা ছোট্ট মসজিদ আর পদ্মপুকুর রামকৃষ্ণ স্কুল। এই স্কুলে আমি ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছি। টিফিন পিরিয়ডে আমরা প্রায়দিন পদ্মপুকুর স্টেশনে ঘুরতে যেতাম। মাঝে কোনা এক্সপ্রেসের জায়গাটা একটা পুকুর আর একটা দুটো খেলার মাঠে চাপা পড়ে ছিল তখন। দু কামরার প্যাসেন্জার ট্রেন প্রথমে কয়লার ইন্জিন টেনে নিয়ে যেত শালিমার থেকে সাঁত্রাগাছি। ট্রেন চলার সাথে সাথে কয়লার গুঁড়ো ক্রমাগত উড়ে আসত আর তাই ইন্জিনের পরেই যে কামরাটা ছিল সেটাতে লোকে পারতপক্ষে চড়ত না। লম্বা লম্বা কাঠের বেন্চ সারি সারি পাতা থাকতো। উপরে উঠে শোয়ার জন্যও একটা দুটো বার্থ ছিল তখনও! উত্তর দিকে ছিল স্টেশনমাস্টারের অফিস যেখানে টিকিট বিক্রী হত। আর দক্ষিন দিকে ছিল গেটম্যানের ঘর যেটা আমাদের কাছে সবথেকে কৌতুহলের ছিল। গেটম্যান গেট নামিয়ে দেবার পর একটা বড় চাবি দিয়ে সেটাকে লক্ করে দিত আর তারপর সেই চাবিটা এনে এই ছোট্ট ঘরটার মধ্যে আর একটা মেশিনে ঢুকিয়ে দিত আর তারপর একটা টেলিফোনে কথা বলত আর টেলিফোন উপরে একটা চাকাকে ক্রমাগত ঘুরিয়ে যেত। কিছুক্ষন পর এই মেশিনের চাবিটাও লক্ হয়ে যেত যা কেবল ট্রেন চলে যাবার পরই খোলা যেত! এরপর শ্রীমান গেটম্যান লাল সবুজ দুটো ঝান্ডা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসত ট্রেন পাস করানোর জন্য।
সেই চাবির বেসস্টেশন এখনও ছোট্ট স্টেশনটার দেওয়ালে লাগানো আছে যদিও সেটা আর ব্যবহার হয় না কারন তার জায়গায় এখন উন্নত ধরনের ইলেক্ট্রনিক্স সিস্টেম এসেছে!
উত্তর দিকে ঠিক লেভেল ক্রসিংটার পেরিয়ে এখন যেখানে একটা ছোট বাজার মতন হয়েছে ওখানে একটা বড় মোটা ভূগর্ভস্ত জলের পাইপ লাইন ছিল। ক্রমাগত জল পড়ে সামনে একটা বড় পুকুর হয়ে গেছিল। আর এখন যেটা মাদ্রাসা স্কুল, তার সামনে ছিল পুকুরটা আর ঠিক পুকুরটার পাশে রেললাইনের ধার ঘেঁসে ছিল একটা প্রায় একশ ফুট উঁচু হাইমাস্ট লাইট টাওয়ার যার আলো তখন দূরদুরান্ত থেকে দেখা যেত! সেই লাইট টাওয়ার আর পুকুরটা আজ আর নেই সেই জায়গায় এখন একটা বড় ওভারহেড জলের ট্যাঙ্ক বিরাজ করছে!
চারদিকে গিজগিজে মানুষ, গাড়ী আর ব্যস্ততার ভিড়ে সেদিনের সেই শান্তশিষ্ট পদ্মপুকুর স্টেশন আজ আর শান্ত নেই। হাওড়া স্টেশনকে ভারমুক্ত করার জন্য বড় বড় বেশ কিছু মেল ট্রেন এখন এই স্টেশনের উপর দিয়ে নিয়মিত চলাচল করে। আর তাই সেদিনের সেই পদ্মপুকুর স্টেশন আজ শুধু স্মৃতির মনিকোঠায় রয়ে গেছে এক চিলতে খুশির স্মৃতি হয়ে!
ক্রমশ...
সোমনাথ



Comments
Post a Comment