Strories of friends lives
বন্ধুনামচা
আজ এই পরিনত বয়সে এসে অবসর সময়ে যখন বন্ধুদের সাথে আড্ডা গল্প করি তখন বুঝতে পারি সবাই কত বিশাল আর বিচিত্র রকমের পরিস্হিতির মধ্যে দিয়ে জীবনের পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে! আজকের গল্পমালা হল সেই বিচিত্র জীবনযাত্রার কিছু সুক্তিরত্নাবলি।
১. তাস খেলা রহস্য: মুকুল আর আমার একটা করে ফ্লাট আছে শিবপুরে যেটা অধিকাংশ সময় খালি পড়ে থাকে। আমাদের আড্ডা ঘুরেফিরে এখানেই বসে। তা সেদিন সন্ধেবেলা জোর কদমে আড্ডা চলছে মুকুলের ফ্লাটে, সঙ্গতে চিকেন রেশমি কাবাব আর মুড়ি চপের মিশ্রন। মুড়ির এক একটা সুখী গ্রাসের সাথে সুমিত বীরদর্পে ২৫-২৬ বিত্তবর্ষে ওর চাটার্ড ফার্মে ইনকাম ট্যাক্সের বিভিন্ন লোচার কাহিনী বর্ননা করছে। মুকুল ফ্লাটের চাবিটা নিশব্দে সৌমেনের হাতে দিয়ে বেরিয়ে গেল। সেদিন আড্ডা শেষে বেরোনার সময়ও মুকুলের দেখা পাওয়া যায় নি। আর তারপর থেকে যতবার মুকুলের ফ্লাটে আড্ডা মারতে গেছি ততবার দেখেছি যে ও ঠিক মাঝখানে আধঘন্টা বা এক ঘন্টার জন্য গায়েব হয়ে যায়! আর তারপর আবার ফিরে এসে স্বমহিমায় লেগে পড়ে আড্ডায়! জিজ্ঞেস করলে বললে বলে একটুা তাস খেলে এলাম!
সেদিন আমি ওকে আড্ডার মাঝে বেরিয়ে যাবার আগে একদম চেপে ধরে ধরলাম - তোকে আজকে বলতেই হবে কোথায় টাইম আউট করতে যাস! তুইতো কোনওদিন তাসের পোকা ছিলিস না, বরং গল্পে কানের পোকা বের করতে তোর জুড়ি নেই! ও বললে আগে আমাকে যেতে দে, এসে বলছি। সেদিন খুব তাড়াতাড়ি ও ফিরে এল আর এসে যেটা বলল সেটা রীতিমত অবাক করে দেবার মত - একজন মৃত্যু পথযাত্রী বৃদ্ধকে তাস খেলায় সঙ্গত দিতে ও রোজ যায়! বৃদ্ধ টার্মিনাল রোগাক্রান্ত কিন্তু তাস খেলতে খুব ভালোবাসেন। ক্লাবের মেম্বার - ওর ছেলে বাবাকে রোজ গাড়ী করে নিয়ে আসে, তাসের আসরে বসায় আর তারপর তাস খেলা হয়ে গেলে উঠিয়ে নিয়ে চলে যায়। মৃত্যুপথযাত্রী বৃদ্ধ মুকুলকে রোজ ব্রীজ আসরের পার্টনার হিসাবে চান আর মুকুলেরের হিম্মত নেই সে উপরোধ ফেরানোর!
শোনার পর আমাদের সবায়ের চোখও অজান্তে বোধহয় একটু ছলছল করে উঠেছিল কিন্তু বেরসিক মুকুল এরপর যা বলল সেটাও কম নয় - দেখিস এ কেস বেশিদিনের নয় খুব শিগ্গিরই.... ! কিংসুক রে রে করে মুকলকে মারতে ছুটল।
২. ডাইনিং টেবিলের লড়াই: একটা বন্ধুর বাড়ীতে ডাইনিং টেবিলে একটা লড়াই নিত্য নৈমিত্তিক হয় আর সেটা হল - মা চান ভগবানের পূজার ফুল আর মাছ দুটো দুদিকে থাকবে। মাছের ব্যাগটা যেন ফুলের সাথে টাচ্ না করে এবং মাচের ব্যাগটা যেন আলাদা আনা হয়। বন্ধু রোজ সকালে বাজার করে এনে ব্যাগ দুটো টেবিলে ফেলে দেয় আর তারপর চান করতে ছোটে। বন্ধুর স্ত্রী, শাশুড়ীর আসার আগেই দুটো ব্যাগের মধ্যে তফাত করে দেয় আর তাতে যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা নির্মূল হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও মা একবার জিজ্ঞেস করেন - ব্যাগদুটো একসাথে ধরিস নিস তো? বন্ধু নির্দিধায় বলে দেয় - না না দুটো ব্যাগ স্কুটারের দুদিকে থাকে, একটা হিন্দুস্হান আর একটা পাকিস্হান, ঠেকার কোনও সুযোগই নেই! সমস্যা হয় সেইদিন যেদিন টাইমিং টা ম্যাচ করে না। বন্ধুর স্ত্রীর পৃথকীকরনের আগেই মা দেখে ফেললেন আর সেদিন একটা মিনি ভারত পাকিস্হান যুদ্ধ মোটামুটি হতে হতে ঠেকানো হয় যখন আমার বন্ধু একটা অসম্ভব অঙ্গীকার করে বসে যে কাল থেকে ও আগে ফুল আর সব্জীবাজারটা করে ব্যাগটা ঘরে নামিয়ে তারপর আবার যাবে মাছ কিনতে! মা রাগে গজগজ করতে করতে মোটামুটি মেনে নেন ব্যাপারটা!
৩. বিবাহনামচা: আজ যাদের বয়স ৮০ থেকে ৯০ মানে আমাদের বাবা মায়েদের কালে বিবাহ মানে পুরোটাই একটা তাঁদের গুরুজন কেন্দ্রিক ব্যাপার ছিল! যারা আসলে বিয়ে করছে তাদের কাছে একটাই অপশন ছিল - বাবা, মা ও গুরুজনেরা যা ভালো বুঝেছেন সেটাই করেছেন এবার তাদের দায়িত্ব সর্বৌতভাবে সেটাকে সাফল্যমন্ডিত করা। এবং সেই বিবাহ প্রায়শই সফল হয়েছে। যার ফলস্বরুপ আজ আমরা মানে তাঁদের ছেলেমেয়েরা আমাদের পরিবারকে গড়ে তুলতে পেরেছি। এবার আজ যাদের বয়স ৬০ থেকে ৭০ মানে আমরা মোটামুটি সেই পুরানো পরিবারতান্ত্রিক ধ্যানধারনাতেই গড়ে উঠেছি। আমাদের ক্ষেত্রে এক আধটা বিবাহবিচ্ছেদের কাহিনী অবশ্যই আছে কিন্তু তা খুবই নগন্য বা জানতেই পারা যায় নি বহুক্ষেত্রে। এবারে আজ যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৫ অর্থাৎ আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যাদের গালভারী নাম হল - জেনারেশন জী, এরা মূলত সবাই অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী! ফলত বিবাহকে সাফল্যমন্ডিত করার জন্য যদি একপক্ষকে কখনও বেশী স্বার্থত্যাগ করার দরকার পড়ে তবে এদের ক্ষেত্রে তা প্রায়শই ব্যাকফায়ার করে এবং বিবাহ বিচ্ছেদের দিকে অভিমূখ নেয়! আমি চোখের সামনে বহু উদাহরণ প্রতিনিয়ত দেখতে পাচ্ছি। আমার আশেপাশে বা বন্ধুকূলে ভুরি ভুরি উদাহরণ দেখতে পাই।
অর্থাৎ পরিবার গড়ে না ওটার মূল কারন কি অতিরিক্ত স্বাধীনতা যা জন্ম দেয় অসহিষ্ণুতা? কিছুটা তো বটেই! পরিবারের প্রভাব ও কন্ট্রোল , জেন জীর উপর কাজ করে না, হয়তো! বা অতিরিক্ত স্নেহ ভালোবাসা জেন জীকে স্বাধীনভাবে পরিবেশকে কন্ট্রোল করার চাবিটাই দেয়নি কোনওদিন!
এই যদি জেন জীর অবস্হা হয়! এদের পরবর্তী প্রজন্ম মানে এখন যাদের বয়স ৪ বা ৫ এরা কি করবে ভাবতে ভয় লাগে!
পেমেন্ট আছে বেরোচ্ছি: একজনে বন্ধুর চালু ব্যবসা। ব্যবসার কারনে ঘরের টুকিটাকি জিনিষে বেশি নজর দিতে পারে না। বন্ধুপত্নীই মোটামুটি ঘরের সমস্ত দায়িত্ত্ব সামলান। এমতবস্হায় ঠোকাঠুকি একটু লেগেই থাক। কিন্তু আমাদের বন্ধু আরও স্মার্ট খটাখটি লাগার উপক্রম হলেই বন্ধু বলে - পেমেন্ট আছে বেরোচ্ছি! আর তারপরই বেরিয়ে যায়, বন্ধুপত্নীর রাগ চক্ষু দেখার আগেই। বন্ধুর ফিরে আসার পর কাহিনীর পরিনতি কি হয় সেটা অবশ্য শোনা হয় নি।
লেট লতিফ শর্মা:
ক্রমশ...
সোমনাথ

Comments
Post a Comment