Dooarse visit 2026 - final

  ডুয়ার্স ভ্রমন ২০২৬ পর্ব    ৬ তারীখ ১২ - ১৩/৬/২৬

গত তিন বছর ধরে আমরা স্কুলের বন্ধুরা মিলে ডুয়ার্স যাচ্ছি এই পরিনত বয়সে.…........

জঙ্গল ভ্রমন: যেহেতু আমাদের সেদিন বিকেলের জঙ্গল সাফারী রি-শিডিউল করে পরেরদিন সকালে করে দেওয়া হয়েছিল অর্থাৎ জয়গাঁও থেকে ফিরে আমাদের আর কোনও কাজ নেই! আমি দেবানুকে বললাম লান্চ করে আমরা জঙ্গলের আশেপাশে ছোট্ট করে একটু ঘুরতে যাব আর পারলে জয়ন্তী বা ঘিষ নদীর পাড় থেকে ঘুরে আসব। দেবানু কয়েকটা ফোন ঘোরালো এদিক সেদিক আর একদম বিকেল ৪ টের দিকে দুটো তিনচাকা টেম্পো এসে হাজির হয়ে গেল আমাদের জঙ্গল ঘোরাবে বলে। হৈ হৈ করে আমরা সাতজন গাড়ীতে চড়ে বসলাম!


ঘিষ নদীর প্রান্তর।

সুন্দরী বক্সা: জঙ্গলের ভিতরে প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে টেম্পো লাফাতে লাফাতে আমাদের নিয়ে চলল। প্রায় পাঁচ কিলোমিটার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাবার পর পড়ল একটা চওড়া সেতু মজে যাওয়া ডিমা নদীর ওপর। স্হানীয় টেম্পোওলার ভাষায় - বর্ষার একটা দুটো বৃষ্টি হতে দিন আর তারপর দেখবেন এই মজে যাওয়া শুকনো নদীটাই কি ভয়ঙ্কর করাল রূপ ধরবে! নদীর পাড়ে গাছের ওপর অনেকগুল ময়ূর আর শুকনো নদীর বুকে কিছু পাখী আর কাঠবিড়াল কে দেখা গেল বিকেলের পড়ন্ত আলোয় খেলা করছে। আরও পাঁচ কিলোমিটার এগোনার পর এল বক্সার জঙ্গলের মধ্যে তির তির করে বয়ে

জঙ্গল সাফারী শুরু হল।

 যাওয়া জয়ন্তী নদী! নাব্যতা নেই অথচ আয়তনে বিশাল এই নদী। মাঝখানে কিছুটা জায়গা দিয়ে একদম কাঁচের মতো চকচকে জল বয়ে চলেছে। পেছনের দিকে একটা বিশাল পাহাড়ের রেন্জ দেখা যাচ্ছে যা পেরিয়ে এসে জয়ন্তী নদী ডুয়ার্সের এই সমতলে মিশেছে। আমি আর কুন্তল যখন নদীর বুকে প্যান্ট গুটিয়ে নেমে পড়েছি তখন আমাদের বাকী বন্ধুরা রওনা দিল নিকটবর্তী চায়ের দোকানে চা পান করতে। নদীর জলে বেশ কিছুটা হেঁটে আর ফটোগ্রাফি করে আমরা যখন উঠে পড়ে পৌঁছালাম তখন দেখি সুদীপ্ত আর দেবানু সেই দোকানীর সাথে রীতিমতো সেখানকার নদী কেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্হার হাল হকিকত অনুসন্ধান করতে শুরু করে দিয়েছে! অর্থাত আমরা দুজন প্রকৃতিকে জানতে চেষ্টা করছি তখন এই দুজন প্রকৃতিকেন্দ্রিক সমাজকে জানতে চেষ্টা করছে! সবায়ের টেস্ট সমান নয়!

আমরা যখন ফেরত এলাম তখন সন্ধে নেমেছে। জঙ্গলে সন্ধেটা বড় অদ্ভুত! ঝুপ করে নেমে চারদিকটা আবছায়া করে দেয়। একটু আগে আকাশে বিভিন্ন ধরনের পাখী এদিক ওদিক উড়ছিল আর এখন আরও নীচে দিয়ে ডানা মেলে হূশ হূশ করে যেগুল উড়ে যাচ্ছে সেগুল কিংশুক বলল মূলত বাদূড় আর পেঁচা! 

পকোড়া আর চা দিয়ে ওয়াচটাওয়ারে আজকের সন্ধের আড্ডা শুরু করে রাতে ডিনার খেয়ে যখন শুতে গেলাম তখন রাত বারোটা বেজে গেছে! নিশ্চিত করে আশেপাশের জঙ্গলের জন্তুজানোয়াররা আমাদের সাতজনকে মার্ক করে দিয়েছে - বকবকে নিশাচর বুড়োর দল বলে!

জঙ্গল সাফারী: সকাল সাতটায় হাজির হুডখোলা সাফারীর জিপ। সাফারীর সময় মাত্র দু ঘন্টা! জুন মাসের ১৫ তারীখ থেকে জঙ্গল বন্ধ হয়ে যাবে চার মাসের জন্য। এখন এই বর্ষার প্রাক্কালে জঙ্গল যখন ঘন সবুজে ঢেকে গেছে তখন কোনও অবিশ্যাস্য প্রাণীর দেখা পেয়ে যাব এ আশা করা বৃথা। তবে 

জয়ন্তী নদীর সুবিশাল প্রান্তর।

জঙ্গলের এই ঘন সবুজের বনানী তার মাঝে বুক চিরে চলেছে জয়ন্তী নদী আর তার শুকনো পাড় দিয়ে মাইলের পর মাইল সাফারীর নামে গাড়ী নিয়ে ছুট - এ এক অদ্ভুত মাদকতা! চারপাশে বিশাল বিশাল শাল ,বহেড়া আর ময়না গাছ দাঁড়িয়ে আছে। দূরে আকাশে ধনেশ (হর্নবিল), মদনা, চিল আর মাটিতে ময়ূরেরা ঘুরে বেড়াচ্ছ! এর আগে নদীতে নামার আগে জঙ্গলে একপাল গৌর বা বনগরু দেখেছিলাম।  হাতী অবশ্য এখানে খুবই ঘুরে বেড়ায় তার প্রমানস্বরূপ টাটকা বিষ্ঠার দেখা পাওয়া গেল বেশ কয়েকটা জায়গায়। এই মনোরম পরিবেশে দু ঘন্টা সময় এক নিমেষে ফুরিয়ে গেল আর সাফারীর জিপ আমাদের অধিকারী হোমস্টে তে ছেড়ে দিল কাঁটায় কাঁটায় ন টায়।

আকাশ কালো করে ইতিমধ্যে মেঘ দেখা দিয়েছে আর কিছুক্ষনের মধ্যেই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। জঙ্গলের মধ্যে সেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি আর টিনের চালে তার ঝরে পড়ার তীব্র আর্তনাদ চারপাশটাকে একেবারে মুখরিত করে দিয়েছে! রন্জন এককাপ চা নিয়ে বসে গেছে সামনের বারান্দায় আর পেছনের ওয়াচটাওয়ারে বাকিরা! কিংশুক ক্যামেরার টেলিস্কোপিক লেন্সে চোখ লাগিয়ে সামনের গাছগুলেকে স্কান করছে। আমি এই অবসরে নীচে গিয়ে বৃষ্টিতে একটু ভিজে নিলাম!

অর্থাৎ সবাই বৃষ্টিকে এনজয় করেছে কিন্তু নিযের নিযের মতো করে! 

বৃষ্টির পর এক দৃশ্যপট।

আমাদের ফেরত যাবার ট্রেন রাত সাড়ে নটায় সামনেই নিউ আলিপুরদূয়ার স্টেশন থেকে।  অর্থাৎ কোনও টেনশন নেই ট্রেন ধরার!

ভেবেছিলাম জমিয়ে লান্চ করার পর দুপুরে বিছানায় একটু গড়িয়ে নেব কিন্তু দেবানু, কুন্তল, সুদীপ্ত আর সুমিতের মত ক্যারেক্টার যেখানে হাজির সেখানে শান্তির ঘুম আশা করা বৃথা! অর্থাৎ আবার চলল আড্ডা আর এবার আমার ঘরেতে!

পরপর তিনবার এই নিয়ে এই টীমের সাথে আসা হয়ে গেল! পরের বছর আবার প্লান হবে। আর সেই দেবানু আর কুন্তল তুমুল কাঁই করে ঠিক করবে কোথায় যাওয়া হবে আর আমাকে লাস্ট মোমেন্টে বলবে ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য যখন টিকিট প্রায় শেষ হবার মুখে! ব্যক্তিগত জীবনে আমরা সবাই প্রতিষ্ঠিত। আমাদের ছেলেমেয়েদের অধিকাংশের বিয়ে হয়ে গেছে বা অন্য শহরে বা বিদেশে থাকে। আমাদের অধিকাংশই আজ অবসরপ্রাপ্ত। প্রতি বছরের এই ডুয়ার্স ভ্রমনটা আসলে একটা নিছক ভ্রমন নয় এটা একটা ফিরে দেখার প্রবল ইচ্ছা সেই দিনগুলিকে যা আমরা হারিয়ে এসেছি আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে যখন আমরা একই স্কুলে পড়তাম! আজ আমাদের আচরণ  বা বাচনভঙ্গী সেই স্কুলের দিনগুলির সাথে একেবারে মিলে যাচ্ছে যা আমাদের ব্যক্তিগত জীবনে হয়তো বেমানান কিন্তু কে তার পরোয়া করে আর কেনই বা করবে? প্রাণের যোগ বা মনের মিল কে কি উপেক্ষা করা যায়! কাল যখন আমরা ফিরে যাব তখন আমরা আবার আমাদের প্রতিষ্টার মুখোশটা পরে নেব কিন্তু তার আগে এইকটা দিন আমরা মুখোশহীন সেই স্কুলের দিনগুলোতে কাটিয়ে গেলাম আর এটাই হল আমাদের আসল ডুয়ার্স ভ্রমন বা এক ধরনের ফিরে দেখা!

সমাপ্ত।

সোমনাথ বেরা


Comments

Popular posts from this blog

Choti Choti batyen of Jalu86 [10 - 15 March’26]

Memories from Dalma — A Reunion in the Wild [part-1]

Dooarse 2026 part-2